বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরী হয় সেটিও অত্যন্ত পবিত্র সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর এ সম্পর্কের দ্বারাই মানব বংশ বিস্তৃত হয়। মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন,
বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে সম্পর্ক তৈরী হয়, তা অত্যন্ত মধুর, ভালবাসার ও হৃদ্যতার। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,
কিন্তু এ মধুর সম্পর্ক, ভালবাসা এবং সম্প্রীতির মাঝেও ফাটল তৈরী হয় এবং কখনো কখনো তা ভেঙ্গেও যায়। সম্প্রতিকালে দাম্পত্য জীবনের এ ভাঙ্গন বহুগুণে বেড়ে গিয়েছে এবং এতে পারিবারিক ও সমাজিক নানাবিধ সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার বা বিবাহ বিচ্ছেদের বহুবিধ কারণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সম্পর্ককে ভাঙ্গন থেকে রক্ষার জন্য যে সকল বিধি-বিধান রয়েছে, সেগুলো অনুসরণ না করা এবং তালাক দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন না করাও অন্যতম।
দাম্পত্য সম্পর্ককে সুদৃঢ়ভাবে ধরে রাখে যে জিনিষ, তা হলো পারষ্পরিক ভালবাসা, হৃদ্যতা ও সম্প্রীতি। এটি হ্রাস পেলে পারষ্পরিক সম্পর্কও হ্রাস পেতে থাকে। এক পর্যায়ে এটির অনুপস্থিতিতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অবিশ্বাস ও দূরত্ব তৈরী হয় এবং বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য শান্তি বা প্রশান্তি বিনষ্ট হয়। তখনই এ সম্পর্কে ছেদ পরে এবং পরিশেষে বিচ্ছেদের দিকে ধাবিত করে।
এ অবস্থায় বৈবাহিক সম্পর্ককে বিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইসলামী শরী‘আহ পর্যায়ক্রমিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা করেছে এবং সেগুলো অবলম্বন করা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে ভঙ্গুর সম্পর্ক পুন:স্থাপিত হয়ে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। সে ব্যবস্থাগুলো হলো,
১. ভুল-ত্রুটি ও ভুল বুঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করা :
ছোট-খাট ভুল-ত্রুটি থেকেই অনেক সময় ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। এগুলো দূর করার জন্য প্রথমে স্বামী-স্ত্রীকেই উদ্যোগ নিতে হবে। পারস্পরিক আলোচনা, পরামর্শ ও উপদেশ দানের মাধ্যমে এগুলো দূর করা সম্ভব। বিশেষ করে স্বামীকে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
২. সালিস নিযুক্ত করা :
যদি স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ নিজেরা মীমাংসা করতে সক্ষম না হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে স্বামীর পক্ষের একজন এবং স্ত্রীর পক্ষের একজনকে সালিস নিযুক্ত করে তাদেরকে মীমাংসার ভার দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
শরী‘আহ প্রবর্তিত এসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামী-স্ত্রীর মাঝের ভুল বুঝাবুঝি দূর হয় এবং তাদের মাঝে যে দূরত্ব তৈরি হয় তা নিরসন করা সম্ভব হয়। অধিকন্তু তালাকের ক্ষেত্রে সঠিক পন্থা অনুসরণ করাও জরুরী। তাহলে অনেক ক্ষেত্রে অনাকাংখিত তালাকের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
তালাক
তালাক (طلاق) আরবী শব্দ, যার অর্থ : ছেড়ে দেওয়া, মুক্ত করা, স্বামী থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া, বিবাহ বন্ধন মুক্ত করা বা হওয়া। শরী‘আর পরিভাষায়,
নির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অনুষ্ঠিত বিবাহ বন্ধন উঠিয়ে দেওয়াকে তালাক বলা হয়।
ইসলাম বিয়েকে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু তালাককে করেছে নিরুৎসাহিত। তালাক ইসলামে কাম্য নয়। বরং যাতে তালাক সংঘটিত না হয় তার সব রকম প্রচেষ্টা ইসলামে রয়েছে।
তবে দাম্পত্য জীবনে যদি স্বামী-স্ত্রীর মিলমিশ না হয় এবং সংশোধনের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যদি একত্রে ঘর সংসার করা একেবারেই দুরূহ হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে ইসলাম তালাকের অনুমতি দেয়। স্মর্তব্য যে, তালাক বৈধ হলেও এটি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ। হাদীছে এসেছে,
সুতরাং ঝগড়া-বিবাদের সময় রাগ ও উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে যেন-তেনভাবে তালাক দিলে চলবে না, বরং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সংশোধন ও মিলমিশের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর স্বামী যদি একান্তই তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা সুস্থ-শান্ত মাথায় ভেবে-চিন্তে দিতে হবে এবং দিতে হবে শরী‘আহ নির্ধারিত পদ্ধতিতে।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সৃষ্ট বিবাদ ও মনমালিন্য নিরসনের প্রক্রিয়া অবগত না থাকা অথবা অবলম্বন না করার কারণে অনেক সময় তা তালাক পর্যন্ত গড়ায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তালাকের পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারনা না থাকায় বিধি বহির্ভূতভাবে তালাক দিয়ে ফেলে এবং তালাক দেওয়ার পর আর স্ত্রীকে ফেরৎ নিতে পারে না। এগুলোও দাম্পত্য জীবনের ভাঙ্গন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এজন্য এখানে আমরা তালাক দেওয়ার শরী‘আহ সম্মত পদ্ধতির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।
তালাকের শরী‘আহ নির্ধারিত পদ্ধতি
তালাক দেওয়া যদি অনিবার্য হয়ে পরে এবং কেউ যদি স্ত্রীকে তালাক দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাহলে তাকে নিম্নলিখিত পন্থায় তালাক দিতে হবে :
১. স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে তুহর বা পবিত্রাবস্থায়। ঋতু অবস্থায় এবং নিফাসের অবস্থায় তালাক দেয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। যেহেতু ঋতু অবস্থায় স¦ামী-স্ত্রীর মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক থাকেনা, সেহেতু এ অবস্থায় উভয়ের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ও দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া অস¦াভাবিক নয়। পবিত্রাবস্থায় ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হলেও পষ্পরের স¦ভাবগত আকর্ষণের কারণে দৈহিক মিলনের মাধামে তা নিরসন হয়ে থাকে। নিফাস ও ঋতু অবস্থায় এ সুযোগ থাকে না বলে এ অবস্থায় তালাক দেয়া নিষিদ্ধ। যে তুহর বা পবিত্রাবস্থায় স্ত্রীর সংঙ্গে সহবাস করা হয়েছে, সে তুহরেও তালাক দেয়া নিষিদ্ধ। কারণ এ অবস্থায় স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু তা সুষ্পষ্ট হতে সময় লাগে। ফলে স্ত্রী কোন ‘ইদ্দত পালন করবে (গর্ভবতীর না ঋতুমতীর) তা নির্ধারণ করতে পরবর্তী ঋতু শুরু হওয়া বা গর্ভ সুস্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে ‘ইদ্দতকাল প্রলম্বিত হয়ে থাকে। তবে যে স্ত্রীর গর্ভ সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, তাকে সহবাসের পূর্বে বা পরে যে কোন সময় তালাক দেয়া বৈধ।
বিবাহের পর যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হয়নি, সে স্ত্রীকে হায়িজ এবং তুহর উভয় অবস্থায় তালাক দেয়া বৈধ।
২. তালাক দিতে হবে কুরআন-সুন্নাহ প্রদর্শিত পদ্ধতিতে। সে পদ্ধতি হলো :
- ক. তুহর বা পবিত্রাবস্থায় শুধুমাত্র একটি তলাক দেবে। এরপর ‘ইদ্দত অতিবাহিত হলে স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
- খ. দুই তুহরে দুই তালাক দেবে। এ ক্ষেত্রেও ‘ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
এ দুই অবস্থায় ‘ইদ্দত শেষ হওয়ায় পূর্ব পর্যন্ত স¦ামী স্ত্রীকে ফেরৎ নিতে পারে এবং ‘ইদ্দত শেষ হওয়ার পরও পুনর্বিবাহের মাধামে স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করার সুযোগ থাকে।
- গ. তিন তুহরে তিন তালাক দেবে। এক্ষেত্রে তৃতীয় তালাক দেয়ার পর স্ত্রীকে আর ফেরৎ নেওয়ার সুযোগ থাকে না। এমনকি পুনর্বিবাহের মাধ্যমেও নয়। তবে এমতাবস্থায় ‘ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর যদি স্ত্রী অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং দ্বিতীয় স¦ামীও যদি কোন কারণে তালাক দেয় বা মৃত্যু বরণ করে, তাহলে ‘ইদ্দত শেষ হওয়ায়ার পর ইচ্ছা করলে প্রথম স¦ামীর সাথে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।
এভাবে তালাক প্রদান করলে স¦ামী চিন্তা-ভাবনা ও সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনার জন্য অনেক সময় হাতে পায়। ফলে পারিবারিক ও পারিপার্শিক প্রয়োজনে স্ত্রীকে ফেরৎ নিতে চাইলে কোন প্রকার জটিলতা ছাড়াই ফেরৎ নিতে সক্ষম হয়।
তালাক দানের বিদ্‘আতী ও হারাম পদ্ধতি
উপরে বর্ণিত পদ্ধতিসমূহ পরিহার করে যদি কোন ব্যক্তি এক বাক্যে বা এক সাথে তিন তালাক প্রদান করে, তাহলে সে তালাক হবে বিদ‘আত ও হারাম । এ তালাক শরী‘আহ বিরোধী ও কবিরা গুনাহ। হাদীছে এ তালাককে কুরআনের সাথ তামাশার শামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক সাথে তিন তালাক দেওয়া সকল ইমামের মতেই বিদ‘আত ও হারাম। যে ব্যক্তি এভাবে তালাক দেবে, সে কবিরা গুনাহের অধিকারী হবে। অধিকন্তু এ ধরনের তালাক আলকুরআন বা শরী‘আর সাথে তামাশা করার শামিল, যা কোনো ঈমানদার ব্যক্তি করতে পারে না। সুতরাং স্ত্রীকে তালাক দিতে হলে শরী‘আর পদ্ধতি অবলম্বন করে দিতে হবে, যা উপরে আলোচনা করা হলো।
এক সাথে তালাক সাধারণত: স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে বা রাগের বশবর্তী হয়ে দিয়ে থাকে। এক সাথে তিন তালাক বিদ্‘আত ও হারাম হলেও কোনো ব্যক্তি এভাবে তালাক দিলে তা এক তালাক হবে না তিন তালাক হবে- এব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঘোরতর মতবিরোধ রয়েছে। যারা এটিকে তিন তালাক গণ্য করেন, তাদের মতে স্ত্রীর স্বাবাবিকভাবে বিধি মোতাবিক অন্যত্র বিবাহ হয়ে সহবাসসহ ঘর-সংসার করার পর যদি দ্বিতীয় স্বামী স্বাভাবিকভাবে তাকে তালাক দেয় অথবা মৃত্যুবরণ করে, তাহলে ‘ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর ইচ্ছা করলে উক্ত স্ত্রী তার পূর্ব স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।
অন্য দলের মতে এক সাথে তিন তালাক দিলে, সে ব্যক্তি হারাম কাজ করার কারণে কবিরা গুনাহের অধিকারী হবে। তবে এক সাথে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হবে। অত:পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ‘ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে ফেরত নিতে পারবে। আর ‘ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে গেলে, স্ত্রীর অন্যত্র বিয়ে হওয়া ছাড়াই পুনরায় তাকে বিয়ে করতে পারবে।
উপসংহার :
ইসলামী শরী‘আর সকল নিয়ম-বিধান মানুষের কল্যাণে প্রবর্তন করা হয়েছে। সেগুলো মেনে চললে মানুষেরই কল্যাণ হবে। পক্ষান্তরে শরী‘আর নিয়ম লংঘন করলে মানুষেরই অকল্যাণ হবে। সেজন্য তাদেরকে নানাবিধ জটিলতা মোকবিলা করতে হবে। তালাকের ক্ষেত্রে শরী‘আর নিয়ম মেনে চললে, বহুবিধ অসুবিধা থেকে মুক্ত থাকা যাবে এবং পারিবারিক জটিলতা তৈরী হলে তা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে। এজন্য এক সাথে তিন তালাক দেওয়ার শরী‘আহ বিরোধী কাজ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। তাহলে গুনাহ থেকে বাঁচা যাবে এবং বাঁচা যাবে সংকট থেকেও। আল্লাহ আমাদেরকে সর্বক্ষেত্রে শরী‘আর নিয়ম মেনে চলার তাওফিক দান করুন।